সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

‘সাহিত্যের অগ্রগতি আসলে একটি জাতির আরোহণ’ - মুন্সী প্রেমচাঁদ- প্রথম পর্ব/ ‘The ascent of literature is the ascent of a nation’- Munsi Premchand

হিন্দি সাহিত্যে মুন্সী প্রেমচাঁদ এক অবিস্মরণীয় নাম।  সাহিত্য রূপ বিশ্লেষণে  কি ভেবেছেন তিনি ? কিভাবেই বা তিনি দেখতেন  সাহিত্যকে  ? 

‘সাহিত্যের অগ্রগতি আসলে একটি জাতির আরোহণ’ - মুন্সী প্রেমচাঁদ- প্রথম পর্ব/ ‘The ascent of literature is the ascent of a nation’- Munsi Premchand

মুন্সী প্রেমচাঁদ: image courtesy: wekipedia.org

জীবনই হ'ল সেই ভিত্তি যার উপরে সাহিত্য নির্মিত হয়, সাহিত্যের প্রতিটি রূপ স্থাপিত হয়। একটি বিল্ডিংয়ের মিনার, গম্বুজ এবং হলঘরগুলি দৃশ্যমান হয় কিন্তু এর ভিত্তিভূমি অদৃশ্য রয়ে যায়। জীবন ঈশ্বরের সৃষ্ট, এবং তা সীমাহীন এবং অনিবার্য, তা অনির্বচনীয়। সাহিত্য মানবের দ্বারা সৃষ্ট, তাই তা বোঝা এবং উপলব্ধি করা সহজ। ঈশ্বরের কাছে জীবন দায়বদ্ধ কিনা তা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না, তবে সাহিত্য অবশ্যই মানুষের কাছে জবাবদিহি দাবি করে। সাহিত্যের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম রয়েছে যা আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি না।

একজন মানুষ জীবনের গোলকধাঁধায় আনন্দের সন্ধানে নিজেকে নিমজ্জিত করে। কিছু মানুষ ধনরত্নের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেবার চেষ্টা করে, কেউ সুখী পরিবারে, কেউ বড় বড় অট্টালিকায়, কেউ বা বিলাসিতায় আনন্দ খুঁজতে থাকে অবিরাম। ভাল সাহিত্য পড়ার আনন্দ এই আনন্দগুলির চেয়ে বৃহত্তর এবং এই আনন্দগুলির অপেক্ষা অনেক বেশি শুদ্ধ, কারণ এর ভিত্তি সৌন্দর্য এবং সত্যে নিহিত। প্রকৃতপক্ষে সত্য আনন্দই সত্য এবং সৌন্দর্যে নিহিত;আর সেই অভূতপূর্ব আনন্দের এক ঝলক আমাদের মধ্যে চারিত করে দেওয়াই সাহিত্যের আসল লক্ষ্য।

প্রায়শই আমাদের মধ্যে এক অপরাধবোধ জাগ্রত হয় বস্তুগত সামগ্রীর নিরবচ্ছিন্ন সেবনের ফলে।অনেকে জাগতিক বস্তুগত সামগ্রী অপছন্দ করা শুরু করতে পারে, নিজেকে দোষী মনে করতে পারে;তবে সৌন্দর্য্য থেকে প্রাপ্ত আনন্দ বা সুখ অবিভাজ্য এবং অনন্ত, অনিঃশেষ, অফুরন্ত।

সাহিত্যে নয়টি রস রয়েছে। সদর্থক বা উন্নত সাহিত্য যদি আনন্দের দিকে পরিচালিত করে, তবে প্রশ্ন উঠছে বীভৎস রসেও কি সৌন্দর্য বর্তমান? যদি তা না হয় তবে কেন তাকে রসগুলির মধ্যে গণনা করা হয়? প্রকৃতপক্ষে, সৌন্দর্য্য এবং সত্য এই দুইয়েরই উপস্থিতি রয়েছে বীভৎস রসে। যেভাবে শ্মশান বা কবরস্থানকে চিত্রিত করা হয়েছে - তা কতটা ভয়াবহ হতে পারে? তা বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এইপ্রকারে, পিশাচ এবং শয়তানেরা অর্ধ-দগ্ধ মাংস ভক্ষনরত! তারা নিজেদের মধ্যে মানুষের মাংসের উপকারিতার কথা আলোচনা করতে করতে একনাগাড়ে হাড় চিবিয়ে চলেছে - কি ঘৃণ্য এই দৃশ্য! তবুও এই চিত্রটি সৌন্দর্যের দিকে পরিচালিত করে!কারণ এই অনুভূতি এক অনন্ত সৌন্দর্য্যের দিকে করে, পরম উচ্চতর সুখের সন্ধান দেয়, যা ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়।

সাহিত্যে  রস এবং প্রতিটি সংজ্ঞা-অবস্থানেই সৌন্দর্য্যে খুঁজে নিতে হয়: রাজার আলোকজ্জ্বল প্রাসাদে, নিঃসম্বলের কুঁড়েঘরে, পয়ঃপ্রণালীর মধ্যে, আরক্ত ভোরে এবংবর্ষণমুখর রাতে।কিন্তু, আশ্চর্যের বিষয় এই যে, রাজবাড়ীর তুলনায় সৌন্দর্য্যের ঝলক দেখা যায় সম্বলহীনের কুটিরে! খুব বেশি ঝলমলে হয় তা সৌন্দর্য্যের আলোতে।

সত্যের সাথে আত্মার  তিনটি সম্পর্ক রয়েছে। প্রথমটি হ'ল কৌতূহল, দ্বিতীয়টি উদ্দেশ্য এবং তৃতীয়টি আনন্দের।

 কৌতূহল হ'ল দর্শনের বিষয়, এবং উদ্দেশ্য বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত; কেবল আনন্দই  সাহিত্যের বিষয়। সত্য যখন আনন্দের উৎস হয়ে যায়, তখন তা হয়ে ওঠে সাহিত্যেরই  অংশ।কৌতূহল চিন্তার দ্বারা অনুপ্রাণিত, এবং উদ্দেশ্য স্বার্থ এবং বুদ্ধি দ্বারা। আনন্দ আবেগের সাথে সম্পর্কিত, এবং সাহিত্য শুধুমাত্র  আবেগ থেকে উদ্ভূত  হয়।

উদাহরণস্বরূপ, তুষারাবৃত পাহাড়ের উপর ভোরের যে অপূর্ব চিত্র আমরা দেখি সেই দৃশ্যে আমরা তিনটি ভিন্ন উপায়ে  প্রতিক্রিয়া জানাতে পারি। এই জাতীয় দৃশ্য দেখে একজন দার্শনিক গভীর  চিন্তায় ডুবে যাবেন ।একজন বিজ্ঞানী গভীর অনুসন্ধানে প্রবৃত হ'ন। একজন সাহিত্যিক অবশ্য পরিতোষী ব্যক্তি হন। পরমানন্দ হ'ল আত্মসমর্পণের মতো। এখানে কেউ বিচ্ছেদ অনুভব করে না।এখানে, উচ্চ এবং নিম্ন, ভাল এবং খারাপের মধ্যে বৈপরীত্য বা দ্বন্দ্বগুলি অদৃশ্য হয়ে যায়, অস্পষ্ট হতে থাকে তা। আত্মা পুরো বিশ্বের  কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করে।বিস্তৃত এই বিশ্ব।একজন ব্যক্তির আত্মা যত বেশি বিস্তৃত হয় তা ততবেশি দুর্মূল্য হয়ে ওঠে।  প্রকৃতপক্ষে,   মানুষ তার সর্বাপেক্ষা নিজের যে গুনকে বিকশিত করতে পারে, তা হ'ল, তার স্বত্ত্বাকে প্রাণহীন বিশ্বের সাথে মিশিয়ে দিতে পারে।

মানুষের জীবন অবশ্যই শুধুমাত্র বেঁচে থাকা, খাওয়া, ঘুমানো এবং তারপরে মারা যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সমস্ত জীবেরই  এক উদ্দেশ্য থাকা উচিত। প্রকৃতি সাথে একাত্মতাই তার  উদ্দেশ্য।  প্রখর ব্যক্তি-বৈশিষ্ট্য দেখা যায় কিছু মানুষের মধ্যে, আবার কিছু মানুষের মধ্যে  সীমাবদ্ধতাও থাকে।  অহংকার, ক্রোধ এবং ঘৃণা বিচ্ছিন্নতা স্থায়ী করে।আমরা যদি আমাদের জেদের বশে তাদের পরখ না করা অব্যাহত রাখি তবে তারা আগামীতে  আমাদেরকে  ধ্বংসের পথে ঠেলে দেবে।  এজন্য আমাদের তাদের ব্যক্তি-চৈতন্যে লাগাম পরানো  দরকার, তবে তা কীভাবে সম্ভব ?

অবাধ্য  শিশুদের বকুনি দেওয়া বা  তারা কোনও কিছুই করতে পারবে না এই জাতীয় কথা বলা কোনো কাজে আসে না আসলে, সময়ের অপচয় ছাড়া।অনেকে মনে করে, এ জাতীয় পদক্ষেপ তাদের আচরণকে পরিবর্তন করবে, উৎসাহিত করবে তাদের ইতিবাচক স্বভাবগুলিকে। কিন্তু আদতে যা প্রয়োজন তা হ'ল তাদের নেতিবাচক স্বভাবগুলিকে দূরীভূত করা। আমরা বাচ্চাদের কেবলমাত্র  ভালোবাসা  এবং স্নেহের দ্বারা প্রভাবিত করতে পারি, বকাঝকা করে নয়।একইভাবে, নেতিবাচক স্বভাব বা প্রবৃত্তিগুলি যদি মানুষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে, তবে সুশৃঙ্খলতার জন্য, আমাদের এমন সম্ভাবনাকে উদ্দীপিত করতে হবে যা সমগ্র  প্রকৃতি সত্ত্বার  সাথে  মানুষের মিলন সাধিত করে।একা সাহিত্যই  গভীর মানবিক আবেগতাড়িত সংবেদন উন্মুক্ত করতে সক্ষম।  একত্রিত করে এই সু-প্রবৃত্তিগুলিকে,নতুন করে আবিষ্কার করে।

সাহিত্য শুধুমাত্র চিন্তার বিষয় নয়; এটি হৃদয়েরও বিষয়। যেখানে জ্ঞান ও উপদেশ ব্যর্থ হয় সেখানে সাহিত্য সফলতা লাভ করে।

আমরা এইভাবে উপনিষদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় ধর্মগ্রন্থগুলিকে  সাহিত্যের সহায়তা প্রাপ্ত হতে  দেখি।আমাদের আধ্যাত্মিক শিক্ষকরা দেখেছিলেন যে, মানুষের আনন্দ ও দুর্দশার বর্ণনা মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। তাই তারা মানবজীবন নিয়ে এমন গল্প তৈরি করেছিলেন যা আমাদের জন্য আনন্দের উৎস  হয়ে উঠেছিল।তাই, জাতক, তাওরাত, কুরআন, ইনজিলের গল্পগুলি কেবল মানুষের জীবন-পথের গল্পের সংগ্রহ মাত্র।

(চলবে )





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কাকে বলে স্ট্রিম অফ কনসাসনেস বা মগ্নচৈতন্য ? -পর্ব ১ / What is Stream of Consciousness? Part -1

কাকে বলে স্ট্রিম অফ কনসাসনেস ? সাহিত্য ধারায় এটি এক রীতি, বলতে গেলে লেখনীর এক ধরণ। সাহিত্যের আলোচনায়  কিংবা সমালোচনায় 'স্ট্রিম অফ কনসাসনেস'- ‘Stream of Consciousness’  বা মগ্নচৈতন্য শুধুমাত্র এক শব্দ নয়, এ এক অনন্য, এক স্বতন্ত্র জঁর  ।  মগ্নচৈতন্যের   স্রোত সাহিত্যসৃষ্টির এক অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ন ধারা,  যা কিনা  বিংশ শতাব্দীর কিছু বিখ্যাত লেখক   নিযুক্ত এক স্বতন্ত্র লেখন রীতি। নিজেদের লেখনীতে কিছু ঘটনা পরম্পরাকে  বর্ণনা করতে ব্যবহার করেছিলেন তারা ।  কিন্তু '  মগ্নচৈতন্য '  কী?  কেনই বা  এটি একটি 'ধারা' বা ' জঁর' ?  কিছু  পরিচিতি দিলাম বটে শুরুতে কয়েকটি শব্দকে আশ্রয় করে, তবে  বিস্তারিত আলোচনা  এগোবে আস্তে আস্তে।  এই আপাত সাধারণ এবং একইসঙ্গে ব্যাপকভাবে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা যুক্ত , সাহিত্যিক টার্মটির ধারণা  পরিষ্কার করতে সহায়তা করতে পারে হয়ত এই  আলোচনা ।   Image Courtesy: Steve Jhonson:pixels.com/free image প্রকৃতপক্ষে, ' মগ্নচৈতন্য  '   সাহিত্যের  জঁর  হিসাবে একেবারেই শুরু করেনি    তার  জীবন !  তবে ?   অবাক করা তথ্য এই  যে - সম্ভবতঃ এটি ছিল   এ

নিজের সঙ্গে একা : এমিলি ডিকিনসন / Emily Dickinson : Women Liking Their Own Company

নিজের সঙ্গে থাকতে  চাওয়া কি একান্তই অপরাধ? সব সময় কি  লোকজন সংসর্গে থাকতেই হবে ?  কোনোভাবেই থাকা যায় না কি একা ? একদম একা, নিজের সঙ্গে একা ? "… আমি আমার বাবার জমি ডিঙিয়ে  কোনও বাড়ি বা শহরে যেতে পারি না," এমিলি ডিকিনসন লিখছেন তাঁর চিঠিতে, আর এই চিঠি লেখা হয়েছে লেখক, অবলিশনিস্ট  ও সৈনিক  কর্নেল থমাস ওয়েন্টওয়ার্থ  হিগিনসনকে।  একটি চিঠির  জবাবে তাঁকে এরকমটা লিখেছিলেন এমিলি।  তাঁকে হিগিনসন তিনবার বোস্টনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, বিভিন্ন সাহিত্য বক্তৃতাগুলিতে অংশগ্রহণ করা এবং  অন্যান্য কবিদের সাথে সাহিত্যের আলোচনার জন্য সাক্ষাৎ। হিগিনসনের সঙ্গে এমিলি যোগাযোগ রাখতেন নিয়মিতই, তিনি ছিলেন বহির্জগতের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম, যার সাথে তিনি তাঁর কবিতাও ভাগ করে নিয়েছিলেন। কিন্তু তবুও তিনি তাঁর আমন্ত্রণগুলি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এমনকি অন্য সমসাময়িক কবিদের সাথে দেখাও করতে চাননি। এমিলি ডিকিনসন Image Courtesy : wikipedia.org  সমস্ত মহিলারা নাকি  বিপজ্জনক! আমরা  যদি  বেশিরভাগ ট্রাডিশনাল টেক্সটগুলিতে একটু চোখ বোলাই তাহলেই  একথার সত্যতা যাচাই করা হয়ে যায়। বিশেষত যদি অনুসরণ করি পুরুষদের

বাণিজ্য নগরী মুম্বাই, সুয়েজ খাল এবং দেহ -ব্যবসা / Suez Canal, transformation of Mumbai and its Sex Trade

বাণিজ্য বিস্তার হচ্ছে, নাগরিক সভ্যতা ছড়িয়ে পড়ছে বন্দর-শহর তথা ভারতবর্ষের এই দামি বাণিজ্য নগরীটিতে। এর সঙ্গে সমান্তরালে পতিতালয়গুলি তৈরী হতে শুরু করে,পূর্ব ইউরোপীয় মহিলারাই সামলাতেন তা। সুয়েজ খাল এবং বোম্বাই নগরী , কি ভাবে সম্পর্কযুক্ত ?  ১৮৬৯  সালের ২৭ নভেম্বর,  দুর্ঘটনাটি ঘটে  মিশরে সুয়েজ খাল উদ্বোধনের ঠিক দশ দিন পরে,  মালপত্র  বোঝাই হয়ে  ভারতে আসছিল যে  জাহাজটি সেটি  লোহিত সাগরে ডুবে যায়।   শোক প্রকাশ  করেছিল  বোম্বাই গার্ডিয়ান । সাথে জানিয়েছিল যে, জাহাজটি আসছিল বোর্দো  থেকে, জাহাজের নাম  নোয়েল। সংবাদপত্রে উল্লিখিত, "বার্কটি সুয়েজ খালের মধ্যে  দিয়ে আসছিল ...গন্তব্য ছিল বোম্বাই, আর সঙ্গে নিয়ে আসছিল প্রচুর ওয়াইন" ।   অবশ্য, তাতে অন্যান্য জাহাজের  যাত্রাপথে কোনো  বাধার সৃষ্টি হয়নি। হয়নি কোনো অসুবিধাও। এই সুয়েজ খালের অল্প একটু ভূমিকা দেওয়া প্রয়োজন।  সুয়েজ খাল  ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে; সুয়েজ খালের উন্মুক্তকরণ এক  বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছিল,  বিপ্লব ঘটিয়েছিল ইউরোপ এবং ভারতবর্ষের মধ্যেকার  বাণিজ্যিক সম্পর্কে -  কমিয়েছিল ইংল্যান্ড থেকে উপমহাদেশে ভ্র