সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

দ্যা বেল জার - সিলভিয়া প্লাথ - বাংলায় ভাবানুবাদ/The Bell Jar by Sylvia Plath - Translation In Bengali

 

দ্যা বেল জার - সিলভিয়া প্লাথ - বাংলায় ভাবানুবাদ/The Bell Jar by Sylvia Plath - Translation In Bengali

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রশংসিত আমেরিকান লেখিকা সিলভিয়া প্লাথ ১৯৩২ সালের ২৭শে অক্টোবর ম্যাসাচুসেটসের বস্টনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর লেখা বিশেষত আত্মজীবনীমূলক লেখায়, যেখানে প্রায়শই তাঁর মৃত বাবার সাথে তাঁর সম্পর্ক এর কথা উঠে এসেছে, আট বছর বয়েসে মারা যান সিলভিয়া প্লাথের বাবা। উঠে এসেছে তার সমস্যা এর কথা - বাবার সঙ্গে সমস্যা। এবং তাঁর মানসিক অসুস্থতার কথা। যার সাথে তিনি ১৯৬৩ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি আত্মহত্যা করার আগ পর্যন্ত সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। তাঁর একমাত্র উপন্যাস, ‘দ্য বেল জার’ (১৯৬৩), যা তাঁর মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে প্রকাশিত হয়েছিল, সেটি তাঁর স্নাতককালীন সময়ে ঘটা প্রথম বিষণ্ণতার পর্ব থেকে আরোগ্য লাভের একটি আধা-কাল্পনিক বিবরণ। তাঁর সবচেয়ে সুপরিচিত কাজগুলো হলো তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য কলোসাস অ্যান্ড আদার পোয়েমস’ (১৯৬০), ‘এরিয়েল’ (১৯৬৫) এবং মরণোত্তর প্রকাশিত ‘দ্য কালেকটেড পোয়েমস’ (১৯৮১), যার জন্য তিনি ১৯৮২ সালে কবিতায় পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন।


মুখ বন্ধ 

কাঁচের জারের ভেতরে থাকা একটা মানুষের কাছে, যে এক মৃত শিশুর মতো নির্বাক ও নিশ্চল, এই পুরো পৃথিবীটাই একটা দুঃস্বপ্ন।


‘দ্য বেল জার’-এর মতো মর্মস্পর্শী উপন্যাসের পাতায় পাতায় সিলভিয়া প্লাথ আমাদের এস্থার গ্রিনউডের ভেঙ্গে যাওয়া, নিজেকে কুড়োতে কুড়োতে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যান। মনস্তত্ত্বের এক রোমাঞ্চকর সমিক্ষণ এই উপন্যাস। 


১৯৫০-এর দশকের আমেরিকার প্রেক্ষাপটে রচিত এই অর্ধ-আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসটি নারীদের ওপর চাপানো দমবন্ধ করা প্রত্যাশা এবং সামাজিক রীতিনীতির শ্বাসরুদ্ধকর প্রভাবকে তুলে ধরে। এস্থার যখন তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে লড়াই করে, তখন সে নিজেকে একটি রূপক বেল জারে আটকা পড়া অবস্থায় দেখতে পায়—একটি শ্বাস রুদ্ধ কর কাঁচের ঘের যা তাকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।


প্লাথের আবেগঘন গদ্য এবং এস্টারের উন্মাদ হয়ে যাওয়ার মর্মস্পর্শী চিত্রায়ন ‘দ্য বেল জার’-কে এক কালজয়ী শ্রেষ্ঠকর্মে পরিণত করেছে, যা মানব মনের জটিলতা এবং আত্মপরিচয়ের নিরলস অনুসন্ধানের ওপর এক তীব্র আলোকপাত করে।



পর্ব - এক

 এক অদ্ভুত, গুমোট গ্রীষ্মকাল, যে গ্রীষ্মে রোজেনবার্গ দম্পতিকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে হত্যা করা হয়েছিল, আর আমি নিউ ইয়র্কে ঠিক কী করছিলাম তা নিজেই জানতাম না। মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার কথা ভাবলেই আমার গা গুলিয়ে ওঠে, আর রাস্তার প্রতিটি মোড়ে বা প্রতিটি সাবওয়ের স্যাঁতসেঁতে, বাদামের গন্ধে ভরা প্রবেশপথে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা খবরের কাগজের শিরোনামগুলোতে পড়ার মতো শুধু এই খবরই ছিল। বিস্ফারিত চোখের সামনে যেন এই খবরই পড়বার মতো ছিল। এর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না যে, সারা স্নায়ু জুড়েই ভেবে পাচ্ছিলাম না, যে শরীরে জীবন্ত দগ্ধ হওয়ার অনুভূতিটা কেমন হতে পারে। বারবার ভাবছিলাম। বরাবর এটাই যেন ভেবে এসেছি !!


আমি ভাবছিলাম এটা নিশ্চয়ই পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ ঘটনা।


নিউ ইয়র্ক এমনিতেই যথেষ্ট খারাপ ছিল। সকাল নটার মধ্যে - সারারাত ধরে কোনোমতে ঢুকে পড়া সেই কৃত্রিম, গ্রাম্য সতেজতাটা একটা মিষ্টি স্বপ্ন শেষ হওয়ার মতো মতো উবে গেল। স্বপ্নের শেষ ভাগে তাই কি দেখলাম! গ্রানাইটের গিরিখাতের গভীরে মরীচিকার মতো ধূসর উত্তপ্ত রাস্তাগুলো সূর্যের তাপে কাঁপছিল, গাড়ির ছাদগুলো হিসহিস করে ঝিকমিক করছিল, আর শুকনো, ছাইয়ের মতো ধুলো উড়ে এসে আমার চোখে ও গলার ভেতর ঢুকছিল।


রেডিওতে আর অফিসে রোজেনবার্গদের কথা শুনতে শুনতে একসময় তাদের কথা আমার মাথা থেকে কিছুতেই বের হচ্ছিল না। ব্যাপারটা ছিল ঠিক যেন প্রথমবার কোনো মৃতদেহ দেখার মতো। এর পরের কয়েক সপ্তাহ ধরে, মৃতদেহটার মাথা—কিংবা তার যা কিছু অবশিষ্ট ছিল—আমার সকালের জলখাবারে ডিম আর বেকনের পেছনে, আর বাডি উইলার্ডের মুখের পেছনে ভেসে উঠত। আর যার জন্যই আমি প্রথম ওটা দেখেছিলাম। আর খুব ধীরে ধীরে আমার এমন অনুভূতি হতে লাগল যেন আমি ওই মৃতদেহটার মাথা একটা সুতোয় বেঁধে বয়ে বেড়াচ্ছি, ভিনেগারের গন্ধে ভরা একটা কালো, নাকবিহীন বেলুনের মতো।


সেই গ্রীষ্মে আমি বুঝতে পারছিলাম আমার কিছু একটা সমস্যা হয়েছে, কারণ আমি শুধু রোজেনবার্গদের কথাই ভাবছিলাম, আর ভাবছিলাম আলমারিতে মাছের মতো নেতিয়ে পড়া ঐসব অস্বস্তিকর, দামী জামাকাপড় কিনে আমি কী বোকামি করেছিলাম। এবং কলেজে যা আনন্দের সাথে জমা পড়ছিল আমার সাফল্য, আমার ছোট ছোট সাফল্য গুলো - ম্যাডিসন অ্যাভিনিউয়ের মসৃণ মার্বেল আর কাঁচ দিয়ে বাঁধানো প্রশস্ত জায়গাগুলোর বাইরে গিয়ে কীভাবে যেন কিছুই না হয়ে মিলিয়ে গিয়েছিল।


আমার জীবনের সেরা সময় কাটানোর কথা ছিল।


সারা আমেরিকা জুড়ে আমার মতো হাজার হাজার কলেজছাত্রীর কাছে আমি ঈর্ষার পাত্রী হওয়ার কথা ছিল, যারা কিনা আমারই মতো সাত সাইজের পেটেন্ট লেদারের জুতো, সাথে মানানসই কালো পেটেন্ট লেদারের বেল্ট আর কালো পেটেন্ট লেদারের পার্স পরে ঘুরে বেড়াতে চাইত। ব্লুমিংডেল'স থেকে এক মধ্যাহ্ন ভোজনের বিরতিতে কেনা হযেছিল এগুলো সব, আর যখন ম্যাগাজিনে আমার ছবিটা বের হলো, আমরা বারোজন কোনো এক স্টারলাইট রুফে, সাদা টিউলের বিশাল এক মেঘের ওপর লাগানো রুপালি লামের নকল কাপড়ের ছোট একটা বডিস পরে মার্টিনি খাচ্ছিl আর আমাদের সাথে আছে সেই অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া করা বা ধার করা নিখুঁত আমেরিকান গড়নের কয়েকজন নাম-না-জানা যুবক—সবাই ভাববে আমি নিশ্চয়ই দারুণ ফুর্তি করছি।





তারা বলত, "দেখো তো এই দেশে কী হতে পারে। একটা মেয়ে উনিশ বছর ধরে কোনো এক প্রত্যন্ত শহরে থাকে, এতটাই গরিব যে একটা পত্রিকা কেনার সামর্থ্যও তার নেই, তারপর সে কলেজে পড়ার জন্য বৃত্তি পায়, এখানে-সেখানে পুরস্কার জেতে এবং শেষ পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক শহরটাকে নিজের ব্যক্তিগত গাড়ির মতো চালায়।"


কিন্তু আমি কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছিলাম না, এমনকি নিজেকেও না। আমি একটা অনুভূতিহীন ট্রলিবাসের মতো শুধু হোটেল থেকে কাজে, পার্টিতে, পার্টি থেকে হোটেলে, আবার কাজে যাচ্ছিলাম। আমার মনে হয়, অন্য মেয়েদের মতো আমারও এই নতুন পরিবেশ নিয়ে উত্তেজনা দেখানো উচিত ছিল, কিন্তু আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারছিলাম না। আমার নিজেকে খুব স্থির আর শূন্য মনে হচ্ছিল, ঠিক যেমনটা কোনো টর্নেডোর কেন্দ্রস্থলে দাঁড়ালে অনুভব করা যায়, যা চারপাশের হট্টগোলের মাঝে নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তারপরে চলতে শুরু করে।


হোটেলে আমরা বারোজন ছিলাম।


আমরা সবাই প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা এবং ফ্যাশন বিষয়ক নিবন্ধ লিখে একটি ফ্যাশন ম্যাগাজিনের প্রতিযোগিতায় জিতেছিলাম। পুরস্কার হিসেবে তারা আমাদের এক মাসের জন্য নিউ ইয়র্কে সব খরচসহ চাকরি দিয়েছিল এবং সাথে ছিল রাশি রাশি ফ্রি বোনাস—যেমন ব্যালে নাচের টিকিট, ফ্যাশন শো-তে যাওয়ার পাস, একটি বিখ্যাত ও দামি সেলুনে চুল সাজানোর সুযোগ, এবং আমাদের পছন্দের ক্ষেত্রের সফল ব্যক্তিদের সাথে দেখা করার ও পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ।


আমাদের বিশেষ গায়ের রঙের সাথে এর সম্পর্ক আছে। ওরা আমাকে যে মেকআপ কিটটা দিয়েছিল, সেটা একজন ব্যক্তির জন্য মাপমতো করে বানানো হয়েছিল এবং এখনও আমার কাছে আছে।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ফ্রানজ কাফকার অনুগল্প - অনুবাদ/ Shorter Story Of Franz Kafka - Bengali Translation

  গাছেরা (The Trees) আমরা যেন তুষারের ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের কাণ্ডের মতো। বাইরে থেকে তাদের এমন মসৃণ মনে হয়, এমন ভাবে শুয়ে থাকে তারা, মনে হয় যে, হালকা এক ঠেলাতেই বুঝি গড়িয়ে যাবে। না—তা হয় না বোধহয়; তারা মাটির সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আটকে থাকে, বিবাহিত দম্পতিদের মতো করে, গভীর বন্ধনে আবদ্ধ। অথচ দেখো, সেই দৃঢ়তাও কেবলই এক বাহ্যিক রূপের প্রকাশ মাত্র। (চলবে) Franz Kafka, ফ্রানজ কাফকা

কাকে বলে স্ট্রিম অফ কনসাসনেস বা মগ্নচৈতন্য / What is Stream of Consciousness?

কাকে বলে স্ট্রিম অফ কনসাসনেস ? সাহিত্য ধারায় এটি এক রীতি, বলতে গেলে লেখনীর এক ধরণ। সাহিত্যের আলোচনায়  কিংবা সমালোচনায় 'স্ট্রিম অফ কনসাসনেস'- ‘Stream of Consciousness’  বা মগ্নচৈতন্য শুধুমাত্র এক শব্দ নয়, এ এক অনন্য, এক স্বতন্ত্র জঁর  ।  মগ্নচৈতন্যের   স্রোত সাহিত্যসৃষ্টির এক অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ন ধারা,  যা কিনা  বিংশ শতাব্দীর কিছু বিখ্যাত লেখক   নিযুক্ত এক স্বতন্ত্র লেখন রীতি। নিজেদের লেখনীতে কিছু ঘটনা পরম্পরাকে  বর্ণনা করতে ব্যবহার করেছিলেন তারা ।  কিন্তু '  মগ্নচৈতন্য '  কী?  কেনই বা  এটি একটি 'ধারা' বা ' জঁর' ?  কিছু  পরিচিতি দিলাম বটে শুরুতে কয়েকটি শব্দকে আশ্রয় করে, তবে  বিস্তারিত আলোচনা  এগোবে আস্তে আস্তে।  এই আপাত সাধারণ এবং একইসঙ্গে ব্যাপকভাবে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা যুক্ত , সাহিত্যিক টার্মটির ধারণা  পরিষ্কার করতে সহায়তা করতে পারে হয়ত এই  আলোচনা ।   Image Courtesy: Steve Jhonson:pixels.com/free image প্রকৃতপক্ষে...