Skip to main content

বাণিজ্য নগরী মুম্বাই, সুয়েজ খাল এবং দেহ -ব্যবসা / Suez Canal, transformation of Mumbai and its Sex Trade


বাণিজ্য নগরী মুম্বাই, সুয়েজ খাল এবং দেহ -ব্যবসা / Suez Canal, transformation of Mumbai and its Sex Trade


বাণিজ্য বিস্তার হচ্ছে, নাগরিক সভ্যতা ছড়িয়ে পড়ছে বন্দর-শহর তথা ভারতবর্ষের এই দামি বাণিজ্য নগরীটিতে। এর সঙ্গে সমান্তরালে পতিতালয়গুলি তৈরী হতে শুরু করে,পূর্ব ইউরোপীয় মহিলারাই সামলাতেন তা। সুয়েজ খাল এবং বোম্বাই নগরী , কি ভাবে সম্পর্কযুক্ত ?

 ১৮৬৯  সালের ২৭ নভেম্বর,  দুর্ঘটনাটি ঘটে মিশরে সুয়েজ খাল উদ্বোধনের ঠিক দশ দিন পরে, মালপত্র  বোঝাই হয়ে ভারতে আসছিল যে জাহাজটি সেটি লোহিত সাগরে ডুবে যায়। শোক প্রকাশ করেছিল বোম্বাই গার্ডিয়ান । সাথে জানিয়েছিল যে, জাহাজটি আসছিল বোর্দো  থেকে, জাহাজের নাম  নোয়েল। সংবাদপত্রে উল্লিখিত, "বার্কটি সুয়েজ খালের মধ্যে  দিয়ে আসছিল ...গন্তব্য ছিল বোম্বাই, আর সঙ্গে নিয়ে আসছিল প্রচুর ওয়াইন" 

অবশ্য, তাতে অন্যান্য জাহাজের যাত্রাপথে কোনো  বাধার সৃষ্টি হয়নি। হয়নি কোনো অসুবিধাও। এই সুয়েজ খালের অল্প একটু ভূমিকা দেওয়া প্রয়োজন। সুয়েজ খাল ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে; সুয়েজ খালের উন্মুক্তকরণ এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছিল, বিপ্লব ঘটিয়েছিল ইউরোপ এবং ভারতবর্ষের মধ্যেকার  বাণিজ্যিক সম্পর্কে - কমিয়েছিল ইংল্যান্ড থেকে উপমহাদেশে ভ্রমণের সময়কালকে, যে পথ জাহাজে পেরোতে সময় লাগতো   তিন মাসাধিককালেরও অধিক, তা কমিয়ে মাত্র চার বা পাঁচ সপ্তাহের ব্যবধানে  নিয়ে আসা গেছিল। কারণ, সুয়েজ খালের মধ্যে রাস্তা হয়  শর্টকার্ট,  নাহলে এর আগে, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপের পাশ দিয়ে  জাহাজগুলিকে ঘুরে যেতে হ'ত।   


বাণিজ্য নগরী মুম্বাই, সুয়েজ খাল এবং যৌন ব্যবসা /  Suez Canal, transformation of  Mumbai  and its Sex Trade
উনিশ শতকের তুলা ব্যবসায়ী: Image Courtesy : Wikimedia Commons

এর অল্প সময়ের পরেই, গ্লাসগো থেকে স্টার্লিং নামে এক স্টিমার সুয়েজ খাল পেরিয়ে মুম্বাই পৌঁছায় মাত্র  ১৬ ঘণ্টার মধ্যে। সারা বিশ্ব সুয়েজ খালের অব্যাহত গুরুত্বের কথা স্মরণ করেছে অবশ্য তার কিছু সময় পরেই, ১৮৭০ সালের ২৩ শে মার্চ , যখন এভার গিভেন নামে একটি ৪০০ মিটার দীর্ঘ শিপিং কন্টেইনার চ্যানেলটিতে ঢুকে গিয়ে আটকে পরেছিল, চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল অন্যান্য জাহাজের। বিভিন্ন দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি থমকে গিয়েছিল। 

 বলা যেতে পারে সুয়েজ খাল নিয়ে এই সাম্প্রতিক  দুর্যোগই আসলে  প্রায় দেড়শ বছর আগে খালটির উদ্বোধন এবং সেটা নিয়ে জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া উত্তেজনার কথা স্মরণ করায়।এবং তৎকালীন বোম্বাই অধুনা মুম্বাই শহরকে কীভাবে রূপদান করেছিল তাও মনে করায়।

গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া 

উপমহাদেশের পশ্চিম উপকূলে সর্বাধিক উন্নত বন্দরনগরীর নাম বোম্বাই বা মুম্বাই। এই মুম্বাই ইউরোপ থেকে আগত জাহাজগুলির  জন্য পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে, এবং কালক্রমে তা রূপান্তরিত হয় গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়াতে। রেলপথের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কও  ক্রমবর্ধমান মহানগরীকে দেশের অন্যান্য অংশের সাথে সংযুক্ত করছিল। 

 সুয়েজ খালের উন্মুক্তকরণ এবং ঠিক এর দু'বছর পরে  ইন্দো-ইউরোপীয় টেলিগ্রাফ স্থাপনের এক গূঢ় অর্থ হ'ল "ভারতের পণ্যগুলি বিদেশে প্রচুর পরিমাণে এবং আরও দ্রুতগতিতে রপ্তানি হতে থাকবে, তা আরো দ্রুত নিঃশেষ  হতে থাকবে, ফলস্বরূপ বাড়বে আরও রপ্তানি এবং ক্লোজ স্পট এবং ফরোয়ার্ড চুক্তির ভিত্তিতে সেগুলি পরবর্তীতে বেচা -কেনাও করা যাবে", এরকমই একটি রিপোর্ট পেশ করা হয়েছিল  বোম্বে চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে; প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে: "পণ্যগুলির দ্রুত চলাচল এবং পূর্ব-পশ্চিম বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান উর্ধমুখী আর্থিক বাণিজ্যিক লেনদেনের অর্থ হ'ল  - ব্যাঙ্ক, বীমা এবং শিপিংয়ের জিনিসপত্র প্রেরণ কিংবা স্থানান্তরকরণ অর্থে ) বাণিজ্য সহযোগী আনুষঙ্গিক পরিস্থিতির  জন্য মূল্যবান এক সুযোগের দরজা খুলে যাওয়া।"

মহাদেশগুলির মধ্যে দূরত্ত্ব কমতে শুরু করেছিল , ভ্রমণ উঠছিল আগের তুলনায়  দ্রুত এবং আরও আরামদায়ক, মুম্বাইয়ের জন-জীবনের ব্যবসা ক্ষেত্রগুলিতে বিভিন্ন সুযোগ তৈরী হতে শুরু করেছিল, পরিবর্তন ধরা পরছিল নগর-জীবনে, আমোদ-প্রমোদের জন্য তৈরী হচ্ছিল যৌনপল্লীগুলি।  

“১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল উন্মুক্ত করে দেবার আগে, পূর্ব ইউরোপের বিদেশিনী গণিকারা কার্যত বোম্বাইতে অজানাই  ছিল এবং ছিল  অনৈতিকও । ভয়ঙ্কর অপরাধ, নীতিগত ভাবে সীমাবদ্ধ বলে স্বীকৃত ছিল, যেরকম ছিল ইউরেশিয়ান বা ভারতীয় নগরনটীদের ক্ষেত্রে,” এমনই বক্তব্য রেখেছেন  সিভিল সার্ভেন্ট এস এম এডওয়ার্ডস ১৯২৯ সালে প্রকাশিত তাঁর বই দ্য বোম্বাই সিটি পুলিশ -এ  (The Bombay City Police, published in 1929 by civil servant SM Edwards)।  তবে “একবার যখন … ইউরোপের বৃহৎ জাহাজ -কোম্পানিগুলি ভারতের সাথে নিয়মিত স্টিমার-যোগাযোগ স্থাপন শুরু করেছিল, এবং মিশরের পোর্ট সাঈদে  ধীরে ধীরে  ইউরোপের ইতর-শ্রেণীভুক্ত লোকজনের  আনাগোনার শুরু হল, এই বন্দরটি জাহাজগুলির জন্য একটি  আশ্রয়স্থল বিশেষ ছিল, যাকে বলে Port Of  Call, এই বন্দরে জাহাজগুলি কিছুক্ষনের জন্য থামত রসদ সংগ্রহের জন্য। ভারত এই বিশ্বব্যাপী দেহ-ব্যবসায়ের  কক্ষপথে অন্তর্ভুক্ত হল।'' বলেছেন লেখক। 

 এডওয়ার্ডস লিখেছেন, “মহিলারা ( দেহপোজীবিনী ) সাধারণত একা আসতে শুরু করে, কোনো সঙ্গী থাকত না তাদের সঙ্গে, স্বামী-পরিবারের অন্য কেউই থাকত না তাদের সঙ্গে, নিজেদের ইচ্ছেতেই আসতো তারা, এবং বোম্বাই বন্দরে পা রাখার আগেই  তারা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল তারা, ছিল বেশি বয়সী। পতিতালয়ের বয়স্ক- গণিকারা, যারা নিজেরা সেই সময় আর গণিকাবৃত্তিতে নেই, তার পূর্বসূরীর বাড়িতেই বসবাস করত, নিজেদের ভরণপোষণের জন্য মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময় অন্যান্য গণিকাদের (যাদের বয়স অল্প এবং যারা সেই বর্তমান সময় দেহ ব্যবসা করত) সেই বাড়িতে থাকতে দিত, দেহ-ব্যবসায়িনীদের  প্রতিদিনের উপার্জনের পঞ্চাশ  শতাংশ দিতে হত।  

 উনিশ শতকের শেষের দিকে, বোম্বাই শহরে  সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ইউরোপীয় দেহ-ব্যবসায়িনীরা ছিল, অন্যান্য ভারতীয় শহরের চেয়ে তার সংখ্যা ছিল অনেকটাই বেশি , অশ্বিনী তাম্বে লিখেছেন তাঁর কোডস অফ মিসকন্ডাক্ট: রেগুলেটিং প্রস্টিটিউশন ইন   লেট কলোনিয়াল বোম্বাই বইতে (Ashwini Tambe: Codes of Misconduct: Regulating Prostitution in Late Colonial Bombay) । " এমনকি পোল্যান্ড থেকেও দেহ-ব্যবসায়ী মহিলারা পতিতালয়গুলিতে কাজ করতে এসেছিল," তিনি উল্লেখ করেছেন।

 সফেদ গল্লি 

 অনেক ইউরোপীয় দেহ-ব্যবসায়ী মহিলা তারদেও, গ্রান্ট রোড এবং বাইকুল্লার  পতিতালয়ে কাজ করত, যেখানে শুক্লাজি স্ট্রিটের একটি অংশ "সাফেদ গলি" বা "হোয়াইট লেন" নামেও  পরিচিত ছিল। তাম্বে আরও  লিখেছেন, "বর্ণগত বিশুদ্ধতা রক্ষা এবং বর্ণ-সংকরপ্রবণতা রোধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত হয়েছিল সেই সময়।"

 তাম্বে উল্লেখ করেছেন, ইউরোপীয় পতিতালয়গুলির অস্তিত্ব নির্ভর করত ঔপনিবেশিক  প্রশাসকদের তিনটি স্বতন্ত্র অপরিহার্য অনুজ্ঞার  দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল: ব্রিটিশ সেনা ও নাবিকদের জন্য যৌন বিনোদন প্রদান, ভিন্ন জাতির মধ্যে  শারীরিক মিলনে  প্রতিরোধ বা ইন্টাররেসিয়াল সেক্স প্রিভেনশন এবং ব্রিটিশের জাতীয় প্রতিপত্তি বা বলা ভালো ন্যাশনাল প্রেস্টিজ সংরক্ষন!

 তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, "যদিও ব্রিটিশ প্রশাসকরা পতিতালয়গুলিকে ত্যাগ করেছিল নিজেদের পছন্দ অনুসারেই, যেভাবে তারা সেগুলি গড়ে তুলেছিল, তারা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিল যে পতিতালয়ের দেহপোজীবিনীরা কোনোমতেই ব্রিটিশ নয়, যা ব্রিটিশ নারীদের  সম্পর্কে ধারণায় খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।"

Comments

Popular posts from this blog

কাকে বলে স্ট্রিম অফ কনসাসনেস বা মগ্নচৈতন্য / What is Stream of Consciousness?

কাকে বলে স্ট্রিম অফ কনসাসনেস ? সাহিত্য ধারায় এটি এক রীতি, বলতে গেলে লেখনীর এক ধরণ। সাহিত্যের আলোচনায়  কিংবা সমালোচনায় 'স্ট্রিম অফ কনসাসনেস'- ‘Stream of Consciousness’  বা মগ্নচৈতন্য শুধুমাত্র এক শব্দ নয়, এ এক অনন্য, এক স্বতন্ত্র জঁর  ।  মগ্নচৈতন্যের   স্রোত সাহিত্যসৃষ্টির এক অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ন ধারা,  যা কিনা  বিংশ শতাব্দীর কিছু বিখ্যাত লেখক   নিযুক্ত এক স্বতন্ত্র লেখন রীতি। নিজেদের লেখনীতে কিছু ঘটনা পরম্পরাকে  বর্ণনা করতে ব্যবহার করেছিলেন তারা ।  কিন্তু '  মগ্নচৈতন্য '  কী?  কেনই বা  এটি একটি 'ধারা' বা ' জঁর' ?  কিছু  পরিচিতি দিলাম বটে শুরুতে কয়েকটি শব্দকে আশ্রয় করে, তবে  বিস্তারিত আলোচনা  এগোবে আস্তে আস্তে।  এই আপাত সাধারণ এবং একইসঙ্গে ব্যাপকভাবে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা যুক্ত , সাহিত্যিক টার্মটির ধারণা  পরিষ্কার করতে সহায়তা করতে পারে হয়ত এই  আলোচনা ।   Image Courtesy: Steve Jhonson:pixels.com/free image প্রকৃতপক্ষে...

সিলভিয়া প্লাথের কবিতার অনুবাদ/ Poetry Of Sylvia Plath - Translation

কবিতার অনুবাদ  Edge By Sylvia Plath The woman is perfected.    Her dead Body wears the smile of accomplishment,    The illusion of a Greek necessity Flows in the scrolls of her toga,    Her bare Feet seem to be saying: We have come so far, it is over. Each dead child coiled, a white serpent,    One at each little Pitcher of milk, now empty.    She has folded Them back into her body as petals    Of a rose close when the garden Stiffens and odors bleed From the sweet, deep throats of the night flower . The moon has nothing to be sad about,    Staring from her hood of bone . She is used to this sort of thing. Her blacks crackle and drag.  প্রান্তে (আক্ষরিক অর্থ) নারীটি যেন বহুদিন ধরে ক্লান্ত ছিল— আজ সে সম্পূর্ণ। মৃতদেহে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন সব হিসাব মিটে গেছে সন্ধ্যার ভেতর। তার সাদা পোশাকের ভাঁজে হেলেনীয় নিয়তির মতো এক শুষ্ক আলো ধীরে ধীরে নেমে আসে। পা দুটি স্থির— মাটি ছুঁয়ে আছে, কিন্তু যেন আর কোনো পথ বাক...

রোনাল্ড ডাহল এর লেখার সেন্সরশিপ ! / Censoring On Roald Dahl's Writing

series - censorship controversy  সিরিজ - সেন্সরশিপ কন্ট্রোভার্সি রোনাল্ড ডাহল এর লেখার সেন্সরশিপ ! / Censoring On Roald Dahl's Writing  শুধুমাত্র নৈতিকতার দোহাই দিয়ে এবার সেন্সরশিপ ? আর সেন্সরশিপ কিনা রোনাল্ড ডাহল এর লেখার উপর ! লেখকের সবচেয়ে পরিচিত এবং জনপ্রিয় বই, যা কিনা শিশুদের জন্য লেখা, তা সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এই কন্ট্রোভার্সির শুরু ।  কিন্তু এই উদ্দেশ্য কি সফল হয়েছে ? নাকি বিরোধী শিবির ব্যর্থ করে দিতে পারে ?  রোনাল্ড ডাহল (Ronald Dahl) : ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (Wikimedia Commons) যদিও ১৯৬০-এ  বেশ কয়েকটি বিখ্যাত বই প্রথমবার প্রকাশিত হয়,  শিশুদের বই ছিল সেই সবগুলোই;  রোনাল্ড ডাহল আজও তরুণদের , যাদের আমরা বলতে পারি ইয়ং অ্যাডাল্টদের কাছে ইংরেজী সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের মধ্যে অন্য তম।  প্রকাশক পাফিনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত, রোল্ড ডাহল স্টোরি কোম্পানির সাথে একত্রে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা , তার উপন্যাসগুলির নতুন সংস্করণে কয়েকশত সংশোধন করা হবে। আর জন্য সাহিত্যিক সালমান রুশদি তাকে অযথা সেন্সর...